ছবি: সংগৃহীত
দেশের অন্যতম কঠোর কার্গো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস অপরাধের সন্দেহে চিহ্নিত অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনারের কোনো ভৌত অবস্থান বা হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গেছে, চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সন্দেহে—কাস্টমসের সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক বা অবরুদ্ধ করে রাখা—২৫০টি কনটেইনারের প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস গত ৯ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) বারবার তাগিদ দিয়েছে। কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখা থেকে চলতি বছরের এপ্রিলে পাঠানো সর্বশেষ তাগাদাটির আগে একই তথ্য চেয়ে অন্তত তিনটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত সেসব কনটেইনারের অবস্থান জানাতে পারেনি।
এদিকে হদিস না মেলা কনটেইনারগুলোর তালিকায় ২০২১ সালের ৮৩টি; ২০২২ সালের ৬১টি; ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনার রয়েছে। কাস্টমসের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত এই চালানগুলো খালাস করার কোনো সুযোগ নেই।
বন্দর সূত্র জানায়, ২৫০ কনটেইনার গায়েবের ঘটনা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি। কারণ অতীতে বড় বড় অস্ত্র ও মাদকের চালান এই বন্দর দিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল সবচেয়ে বড় অবৈধ অস্ত্রের চালান আটক হয় চট্টগ্রামে। কর্ণফুলী নদীর সিইউএফএলের জেটি ব্যবহার করে অস্ত্রগুলো খালাস করার সময় ১০ ট্রাকভর্তি চার হাজার ৯০০টি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭ হাজার গ্রেনেড, আট লক্ষাধিক গুলি ও রকেট লঞ্চার উদ্ধার করা হয়। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
এছাড়া ২০১৫ সালের ৬ জুন সূর্যমুখী তেলের ঘোষণা দিয়ে ৩৭০ লিটার তরল কোকেন আমদানি করে কতিপয় চোরাকারবারী চক্র। যার আনুমানিক মূল্য ছিল ৯০০ কোটি টাকা। এটিও দেশের ইতিহাসে আটক হওয়া সবচেয়ে বড় কোকেন চালান বলে চিহ্নিত। ২০২০ সালে আদালতের নির্দেশে কোকেনগুলো ধ্বংস করা হয়। ২০২১ সালের ১ জুন সরিষা বীজ ঘোষণা দিয়ে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা ৪২ টন পপি সিড আটক করে চট্টগ্রাম কাস্টমস। ২০২২ সালের ২৪ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত তিন ধাপে পাঁচ কনটেইনার বিদেশি মদ ও সিগারেটের চালান আটক করা হয়। এছাড়া অস্ত্র ও মাদকের মতো ছোট-বড় অসংখ্য চালান আটক করা হয় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কনটেইনারগুলোর অবস্থানই খুঁজে না পাওয়ায় কোনো ধরনের পরিদর্শন বা তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এআইআর শাখার ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, আমরা এই কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে চেয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তিন থেকে চারবার চিঠি দিয়েছি। আমাদের শেষ রিমাইন্ডার গত এপ্রিলে পাঠানো হলেও– আমরা এখনো কোনো তথ্য পাইনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা বলতে পারছি না যে সবগুলো কনটেইনারই নিখোঁজ রয়েছে, তবে আমরা বন্দরের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। তাই জোরালো একটা আশঙ্কা রয়েছে যে, এর মধ্যে অনেক কনটেইনারই আসলে গায়েব হয়ে গেছে।
এদিকে কনটেইনারগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানতে না পারায়—কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানিকৃত পণ্য যাচাই করতে পারছে না, তদন্ত শেষ করতে পারছে না এবং শুল্ক জালিয়াতির সন্দেহে থাকা আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপও নিতে পারছে না।
