উত্তরাঞ্চলের কুরবানি ও মাংসের শুটকি আজ কেবলই গ্রামীণ স্মৃতি

লেখক: ইসমত আরা
প্রকাশ: ২ দিন আগে

হরিয়ে গেছে গ্রামীণ ঐতিহ্য। মানুষকে বদলে দিয়েছে বিজ্ঞান । আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে কুরবানির ঈদ মানেই ফ্রিজভর্তি মাংস, অনলাইনে গরুর হাট, মোবাইলে ছবি তোলা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। অথচ সত্তর-আশির দশকে উত্তরাঞ্চলের গ্রামবাংলায় কুরবানির ঈদ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগ, ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধনের উৎসব। তখন এত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না, ছিল না ঘরে ঘরে ফ্রিজ কিংবা মাংস সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা। অথচ আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না। বরং সেই সময়ের ঈদে ছিল আন্তরিকতা, পরস্পরের প্রতি মমতা এবং সহজ-সরল জীবনের অপূর্ব সৌন্দর্য।

সত্তর-আশির দশকে কুরবানির ঈদ আসার অনেক আগ থেকেই গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে শুরু হতো উৎসবের আমেজ। হাটে গরু কেনার জন্য গ্রামের মানুষ দলবেঁধে যেত। কেউ গরুর গায়ের রং দেখে পছন্দ করত, কেউ আবার দাঁত দেখে বয়স আন্দাজ করত। কেউ কেউ বহুদিন ধরে নিজের যত্নে পালন করা গরুটিই কুরবানির জন্য প্রস্তুত করত। এই ঈদে শিশুদের আনন্দ ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা গরুর গলায় দড়ি ধরে বাড়িতে নিয়ে আসত, খড় খাওয়াত, নাম রাখত, নানা আদুরে নামে ডাকত।গরুর গলায় ঘুঙুর পরাত। সেই গরুকে ঘিরেই জমে উঠত ঈদের আনন্দ।

তখনকার দিনে অধিকাংশ পরিবার ছিল যৌথ পরিবার। এক বাড়িতে চাচা-জ্যাঠা-মামা-ফুফুসহ ছিল বড় সংসার। পরিবারে নারীরা কয়েক দিন আগে থেকেই মসলা, মরিচ, ধনিয়া ও হলুদ গুঁড়া করে কৌটায় ভরে রাখতেন। মাটির উঠোন, দোচালা খড়ের বা টিনের ঘর, রান্নাঘর, বাসন-কোসন—সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখা হতো।

কুরবানির দিন ভোর থেকেই উঠোনে শুরু হতো ব্যস্ততা। কেউ পানি গরম করছে, কেউ ছুরি ধার দিচ্ছে, কেউ বড় বড় হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কার করছে। সে সময় অধিকাংশ বাড়িতেই পিতলের হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা হতো। গ্রামের মসজিদের ইমাম এসে কুরবানি সম্পন্ন করতেন এবং গৃহস্থরাই মাংস কাটাকাটি করে প্রস্তুত করতেন।

কুরবানির পরপরই মাংস ভাগাভাগির দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া । সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল,মাংস ভাগাভাগির আগে (গ্রামীণ ভাষায় তাকে মাটিয়া বলা হয়) মাটিয়াটাকে কুরবানির রীতিতে ভাগ করে নিজের অংশটা শিশুদের হাতে দেয়া হত।তারা এটাকে মাটির চুলার আগুনে পুড়িয়ে ভাইবোনেরা অর্থাৎ পরিবারের ছোটরা ভাগাভাগি করে খেত। ভাইবোন বেশি হলে সেই নিয়ে কাড়াকাড়িও লেগে যেত।সে ছিল এক আত্মিক আনন্দ।

কুরবানিরর মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের বাড়িতে আন্তরিকতার সঙ্গে মাংস পৌঁছে দেওয়া হতো। তখন তো ফ্রিজ ছিল না। ফলে এত মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তাই গ্রামের মানুষ বুদ্ধি করে মাংস সংরক্ষণের এক অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করতেন—ঈদের মাংসের শুটকি। এই শুটকি ছিল সত্তর-আশির দশকের গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য ঐতিহ্য।

কুরবানির ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই শুরু হতো মাংস শুকানোর আয়োজন। মাংস ছোট ছোট টুকরো করে লবণ, হলুদ ও কখনো কখনো মরিচ মাখিয়ে বাঁশের চাটাই কিংবা পরিষ্কার সুতায় গেঁথে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। বাড়ির উঠোনে, টিনের চালের ওপর কিংবা বাঁশের মাচায় ঝুলত সেই মাংস। দিনের পর দিন প্রখর রোদে শুকিয়ে মাংস শক্ত হয়ে যেত। সেই শুকনো মাংসই ছিল ঈদের মাংসের শুটকি।

তবে ঈদ যদি বর্ষাকালে হতো, তাহলে শুটকি তৈরি করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য । কিন্তু গ্রামীণ মানুষ তারও উপায় বের করে নিয়েছিল। বাঁশের চালুনি, ডালা কিংবা সুতায় বাঁধা মাংস চুলার ওপর ঝুলিয়ে রাখা হতো। চুলার ধোঁয়া ও আগুনের আঁচে মাংস ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যেত। আবার অনেক সময় অবশিষ্ট মাংস বড় লোহার কড়াইয়ে দীর্ঘক্ষণ ভেজে সংরক্ষণ করা হতো। এতটাই সুস্বাদু ও আলাদা রকমের সুগন্ধি হতো সেই মাংস যে তার স্বাদ আজও অনেকের মুখে লেগে আছে।

এই শুটকি শুধু সংরক্ষণের উপায় ছিল না, ছিল এক ধরনের গ্রামীণ স্বাদ ও সংস্কৃতির অংশ। শীতের দিনে কিংবা বর্ষাকালে যখন ঘরে তরকারির অভাব দেখা দিত, তখন সেই মাংসের শুটকি দিয়ে রান্না হতো বিশেষ ভর্তা বা ঝোল। পেঁয়াজ, রসুন, শুকনা মরিচ আর সরিষার তেলে ভেজে তৈরি করা হতো সুস্বাদু শুটকি ভুনা। কখনো আলুর সঙ্গে রান্না করা হতো। সেই স্বাদ আজকের আধুনিক রান্নাতেও অনেকের কাছে দুর্লভ।

আর গরুর ভূড়ি কিংবা পা—এসব খাবারের তেমন প্রচলন তখন ছিল না তখন। গরুর ভূড়ি কেটে মাছের খাবার হিসেবে পুকুরে ফেলে দেওয়া হতো। কখনো গরিব মানুষ গরুর পা নিয়ে যেত, তবে বেশির ভাগ সময় সেগুলো কুকুরের খাবার হিসেবেই পড়ে থাকত।

এই বিষয়ে গ্রামের শতবর্ষী বৃদ্ধা মালকা খাতুনের স্মৃতিচারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘সেই সময় মানুষের কোন্টে অভাব আছিল! ভূড়ি খাইবে এমন কতা কাঁয়ও ভাবেও নাই। যেই জিনিসত্ গরুর খাবার জমি থাকে, সেটা মানুষ কী করি খাইবে—এইটা ভাবইলে তো ঘিন্না লাগে।’

আশির দশকের কুরবানির ঈদে অপচয় ছিল কম, আন্তরিকতা ছিল বেশি। মানুষ তখন সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিত। আত্মীয়ের বাড়িতে মাংস পাঠানো ছিল সম্পর্ক রক্ষার এক সুন্দর প্রথা। গ্রামের শিশুরা কলাপাতায় মাংস নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত। ঈদের দিন দুপুরে সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া ছিল যেন এক মিলনমেলা।

বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে জীবন অনেক সহজ হয়েছে। ফ্রিজে মাসের পর মাস মাংস সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু সেই পুরোনো দিনের রোদে শুকানো মাংসের গন্ধ, উঠোনজুড়ে ব্যস্ততা আর একসঙ্গে কাজ করার আনন্দ যেন এখন রূপকথার গল্পের মতো শোনায় আজ।

আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না, একসময় ঈদের মাংস শুটকি করে বছরের বিভিন্ন সময়ে খাওয়া হতো। সেই শুটকি ছিল শুধু খাবার নয়, ছিল অভাবের দিনে সঞ্চয়ের বুদ্ধি এবং গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতীক।

সত্তর/ আশির দশকের কুরবানির ঈদ ছিল সরল অথচ গভীর আনন্দে ভরা। সেখানে ছিল না আধুনিকতার চাকচিক্য, কিন্তু ছিল হৃদয়ের টান। ঈদের মাংসের শুটকি আজও সেই সময়ের স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখে। পুরোনো দিনের সেই রোদে শুকানো মাংসের গন্ধ যেন আজও গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়ায়, মনে করিয়ে দেয় এক সময়ের সহজ-সরল অথচ ভালোবাসায় ভরা জীবনের কথা।

লেখক : প্রধান শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট

  • ঈদ
  • ঐতিহ্য
  • কুরবানি
  • গ্রামীণ