বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। ২০২৫ সালে দেশের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বা প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য কিনতে পারেননি। দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় মঙ্গলবার (২১ জুলাই)।
প্রতিবেদনটি যৌথভাবে তৈরি করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘হেলদি ডায়েট বাস্কেট’ (স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার) মূলে রয়েছে দৈনন্দিন মাথাপিছু অন্তত ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরির সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা। এর আওতায় শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শাকসবজি, ফলমূল, শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ, বাদাম ও তেল-চর্বির মতো ছয়টি মৌলিক খাদ্যগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেবল পেট ভরানো নয়, বরং শরীরের সঠিক বিকাশ ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখার জন্য এসব উপাদানের উপস্থিতি অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় এই খাদ্যতালিকা জোগাড় করা দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কেবল বাংলাদেশেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তার এই বৈশ্বিক সংকট পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই দৃশ্যমান। এ অঞ্চলে পাকিস্তানের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক, যেখানে প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার ক্ষমতা নেই। পাকিস্তানের পরপরই দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটের বিচারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২.৬৯ বিলিয়ন বা ৩২.৭ শতাংশ মানুষ সুষম খাবার জোগাড় করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যার মধ্যে আফ্রিকায় এই হার সর্বোচ্চ ৬৬.৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের অযৌক্তিক ও আকাশছোঁয়া দামই এই সংকটকে নিয়মিত উসকে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ, মাংস এবং ফলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ এগুলো খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে দ্রুত তা কার্যকর হলেও বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল স্থানীয় ভোক্তারা সহজে পান না। ফলে সাধারণ মানুষের আয় সামান্য বাড়লেও স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানে তাকালে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে দেশে স্বাস্থ্যকর খাবারের দৈনিক খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশে একজন মানুষের জন্য প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড়ের গড় খরচ ২০১৭ সালে যেখানে ৩.০৯ ডলার পিপিপি বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪.৫৯ ডলারে পৌঁছেছে। খরচের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে মূলত প্রাণিজ আমিষ, ফলমূল এবং শাকসবজি কিনতে, আর শর্করাজাতীয় খাবারে ব্যয় হচ্ছে তুলনামূলক কম। এ অঞ্চলে খরচের বিচারে ভুটান ও শ্রীলঙ্কার পরই বাংলাদেশের অবস্থান হলেও পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর খাবারের সার্বিক খরচ মাত্র ৩.৯৪ ডলার।
অবশ্য এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যেও আশার একটি আলো খুঁজে পাওয়া গেছে পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারার সক্ষমতার সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে। ২০১৭ সালে যেখানে বাংলাদেশের প্রায় ৬২.৮ শতাংশ অর্থাৎ ১০ কোটি ১৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারতেন না, ২০২৫ সালে সেই হার কমে ৩৮.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত বছরগুলোতে খাবারের দাম বৃদ্ধির হারের চেয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য বাবদ বরাদ্দের আয় কিছুটা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই সামর্থ্যহীন মানুষের মোট সংখ্যায় এই ইতিবাচক পতন সম্ভব হয়েছে।
বৈশ্বিক পরিসরেও স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় খরচ সাম্প্রতিক সময়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী দৈনিক সুষম খাবারের গড় খরচ ২.৯৪ ডলার থাকলেও ২০২১ সালে তা বেড়ে ৩.৪৪ ডলার এবং ২০২৫ সালে এসে দাঁড়ায় ৪.২৮ ডলারে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই দৈনন্দিন খরচ ৪.৯১ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির পরও বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে না পারা মানুষের মোট সংখ্যা ২.৯৭ বিলিয়ন থেকে কিছুটা কমে ২.৬৯ বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পুষ্টিকর খাবারকে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে নিয়ে আসতে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে দ্রুত খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো এবং উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার যাবতীয় খরচ কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত সংসংরক্ষণাগার নির্মাণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতির সার্বিক উন্নয়ন, নিখুঁত বাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খাদ্যের যেকোনো ধরণের অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
