রাজধানীর মান্ডায় সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে হত্যার পর আট টুকরা করে মরদেহ লুকিয়ে রাখার পেছনে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। সংস্থাটির অভিযানে ঘটনার প্রধান আসামি হেলেনা বেগম ও তার কিশোরী মেয়েকে গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য সামনে এলো। র্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী তাদের গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেন জানান, নিহতের নাম মোকাররম। তার বাড়ি ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি-প্রবাসী মোকাররমের সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা, সৌদিপ্রবাসী সুমনের সু-সম্পর্ক আছে। সেই সুবাদে সুমন সৌদি আরব থাকাকালে তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার (৩১) সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা বার্তা বলতে থাকে।
গ্রেফতার হেলেনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোকাররম প্রবাসে থাকাকালে তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনাকে বিভিন্ন সময়ে ৫ লাখেরও বেশি টাকা পাঠিয়েছিলেন। গত ১৩ মে সৌদি প্রবাসী মোকাররম নিজ বাড়িতে না জানিয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন। পরে তাসলিমার সঙ্গে দেখা করতে তার বান্ধবী হেলেনা আক্তারের ভাড়াবাসা মান্ডা এলাকায় আসেন। এক রুমের ওই বাড়িতে হেলেনা তার দুই মেয়েসহ ভাড়া থাকেন।
রাতে ওই বাসায় হেলেনার সঙ্গে তাসলিমা, মোকাররম ও হেলেনার দুই মেয়ে একই রুমে ঘুমাতে যান। হেলেনার দাবি, মোকাররমের সঙ্গে তাসলিমার মনমালিন্য হওয়ায় হেলেনার নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে মোকাররম অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করে। বিষয়টি হেলেনা দেখে ফেলেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই রাতে তাসলিমা ও মোকাররমের বিয়ের কথাবার্তা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগে। মোকাররম বিয়ে করতে চাইলে রাজি ছিল না তাসলিমা। এক পর্যায়ে মোকাররম বলে তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া ৫ লক্ষাধিক টাকা ফেরত দিতে হবে। তা নাহলে মোবাইলে ধারণ করা তাসলিমার কিছু ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় মোকাররম।
এই বিবাদ থেকেই তাসলিমা হেলেনাকে সঙ্গে নিয়ে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করে। মেয়ের সঙ্গে মোকাররমের অপকর্ম করার চেষ্টার ক্ষোভ থেকে ওই প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন বলে দাবি করেন হেলেনা। তিনি বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন অর্থাৎ ১৪ মে সকাল বেলা নাস্তার সময় মোকাররমকে পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে মোকাররমকে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে, পরে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে বাড়ির সবাই মিলে মরদেহ আটটি খণ্ড করে পলিথিন ও বস্তায় ভরে তাদের বাথরুমে রেখে দেয়।
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে সুযোগ বুঝে ভিকটিমের পলিথিনে করে সাতটি টুকরা বাসার নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেয়। আর মাথার অংশ বাড়ি থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে ফেলে দিয়ে আসে।
ঘটনার পরের দিন ১৫ মে সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে যান এবং হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে আসে বলেও জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, বাসায় আসার পর তারা রাতে ছাদে গিয়ে পার্টি করে এবং ওই পার্টিতে প্রতিবেশীদেরও অংশ নেওয়ার অনুরোধ করে। পরে শনিবার (১৬ মে) তাসলিমা আক্তার তার ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়।
পরের দিন রবিবার (১৭ মে) দুপুরে লাশ পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর চোখে পড়ে এবং তারা ৯৯৯ এ কল করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের টুকরাগুলোকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে এনআইডি শনাক্ত করে লাশটির পরিচয় পাওয়া যায় এবং উক্ত লাশটি মোকাররমের বলে জানা যায়।
হেলেনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিকটিমের মাথার অংশ বাসা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অপর আসামি তাসলিমা আক্তারকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছে র্যাব।
