ভাঙা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, দায় নিতে নারাজ প্রশাসন

লেখক: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ ঘন্টা আগে
ছবি: সংগৃহীত

ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রবেশদ্বারে নির্মিত ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ ও ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে সরকারি কোনো সংস্থাই এই ভাঙার কাজের দায় নিচ্ছে না। কে বা কারা এটি ভাঙছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সবাই অজ্ঞতা প্রকাশ করায় স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক চত্বরটি ভাঙার কাজ করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বিস্তারিত কিছু না বলে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান বলেন, এটি কেন ভাঙা হচ্ছে তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ভালো বলতে পারবেন।

ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানান, জেলা প্রশাসন এই স্থাপনা ভাঙছে না। তবে তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ভাস্কর্যটি ওই জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক বিভাগ ও পৌরসভা সেই সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ লাইন্সের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কারা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে এই ভাস্কর্য ও চত্বরটি অপসারণ করছে, তা আমার জানা নেই।

জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ জানান, ভাস্কর্যটির নকশাগত ত্রুটির কারণে সেটি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল, তা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল। এ ছাড়া এটি ওই এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরাও এটি দুই দফায় ভাঙচুর করে। তিনি বলেন, কয়েকটি সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হলেও ভাঙার দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি ছিল না। এখন কারা এটি ভাঙছে, তা আমি জানি না।

জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ জানান, বর্তমান কাঠামোটি ভেঙে ফেলা হলেও ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছের গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর জানান, সংসদ অধিবেশন চলায় তিনি ঢাকায় আছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে এখনও অবগত নন।

২০১৯ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভা ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের এই চত্বরটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি, উল্টো আগাছায় ঢেকে গিয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা শহরের প্রবেশমুখে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণ করে কোনো না কোনো স্মৃতিস্তম্ভ থাকে। এই চত্বরটি ছিল আমাদের গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে। কিন্তু কেন এটি এভাবে চুপিসারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহের নন, পুরো দেশের গর্ব। দেশের জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহরের প্রবেশদ্বারে তার নামের চত্বরটি থাকলে নতুন প্রজন্ম ও দর্শনার্থীরা তার অবদান সম্পর্কে জানতে পারত। এটি এভাবে ভেঙে ফেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হামিদুর রহমান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী ছিলেন। ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে।

  • বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
  • ভাঙা
  • ভাস্কর্য